WHAT'S NEW?
Loading...

খোলাচোখে নিউজিল্যান্ডে টাইগারদের ওয়ানডে হোয়াইটওয়াশ

                                                        

এটি ক্রিকেটবিশ্বে ইতিমধ্যে স্বীকৃতি পেয়েছে যে বাংলাদেশ ওয়ানডে ক্রিকেটে খুবই শক্তিশালী একটি দল।আর বিগত বছরগুলোর আইসিসির ওয়ানডে রেঙ্কিংও বাংলাদেশের পক্ষে কথা বলে। তাছাড়া বাংলাদেশের ওয়ানডে দলে বেশকিছু তারকা প্লেয়ার রয়েছেন। তামিম ইকবাল, সাকিব আল হাসান, মুশফিকুর রহিম, মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ, মোস্তাফিজুর রহমানের মত তারকা ক্রিকেটার বাংলাদেশের ওয়ানডে দলে রয়েছেন। এবং এমন বিশ্বখ্যাত তারকারা যে টিমের প্রতিনিধিত্ব করছেন সেই টিমের কাছে প্রত্যাশা স্বাভাবিকভাবে বেশি থাকে। বাংলাদেশ নিউজিল্যান্ড সফরে ওয়ানডেতে তবু শেষপর্যন্ত হোয়াইটওয়াশ হয়েছে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো টাইগাররা তিন ম্যাচ ওয়ানডে সিরিজে কিউইদের বিপক্ষে খুব বেশি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিতে পারেনি । উপরন্তু ফিল্ডিংয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়ে ক্যাচমিস ,ব্যাটিংয়ে নেমে আনপ্ল্যানড ক্রিকেট ইত্যাদি প্রায় প্রতি ম্যাচেই ছিল।তবে করোনার দীর্ঘ বিরতির পর বিদেশ সফরে কিছুক্ষেত্রে আশার আলোও ছিল কিন্তু তা ম্যাচজয় কিংবা সিরিজ জয়ের জন্য যথেষ্ট ছিলনা। নিউজিল্যান্ড সফরে ওয়ানডে সিরিজে বাংলাদেশের পারফরম্যান্স নিয়ে এখানে আলোচনা করব।


তিন ওয়ানডে মূল্যায়ন

এবারের নিউজিল্যান্ড সফরে প্রথম ওয়ানডেতে বাংলাদেশের ব্যাটিং খুবই দৃষ্টিকটু ছিল।দলে এবং একাদশে তামিম ইকবাল, মুশফিক,লিটন, মাহমুদুল্লাহ, মিরাজের মত ওয়ানডে স্পেশালিষ্ট থাকার পরও প্রথম ওয়ানডেতে বাংলাদেশের টোটাল স্কোর দুশো ছুঁতে পারেনি(১৩১/অলআউট)।ফলে যা হবার তাই হয়েছে কিউইরা হেসেখেলে প্রথম ওয়ানডেতে জিতে গেছে। দ্বিতীয় ওয়ানডেতে অধিনায়ক তামিম ইকবাল এবং মোঃ মিঠুনের চমৎকার ব্যাটিংয়ের ফলে ভালো একটি টোটাল পেয়েছিল বাংলাদেশ দল। কিন্তু ফিল্ডারদের ব্যর্থতায় শেষপর্যন্ত এই ম্যাচেও হার মানতে হয়েছে। তৃতীয় ওয়ানডেতে নিউজিল্যান্ডের বিশাল রান তাড়া করতে নেমে  টপঅর্ডারের চরম ব্যর্থতায় শুরুতেই  ম্যাচ থেকে ছিটকে যায় বাংলাদেশ। সবশেষে একটি কথা বলতেই হয় আর তাহলো নিউজিল্যান্ড সফরে টাইগারদের অন্তত একটি ওয়ানডে জেতা উচিত ছিল।

 কেন ওয়ানডে সিরিজে ধবলধোলাই হতে হলো


নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজে বাংলাদেশের ধবলধোলাই হওয়া অবশ্যই একটি হতাশার বিষয়। এবং বাংলাদেশ দলে বেশকিছু তারকা ক্রিকেটার রয়েছেন যারা যেকোন দলের বিপক্ষে ব্যাট হাতে সফলতা লাভের যোগ্যতা রাখেন তবুও নিউজিল্যান্ড সফরে তিন ওয়ানডেতে বাংলাদেশকে সেভাবে খোঁজে পাওয়া যায়নি। আসুন দেখে নেই কেন ওয়ানডে সিরিজে এভাবে টাইগারদের হোয়াইটওয়াশ (ধবলধোলাই) হতে হলো ।

ওপেনারদের দায়

আসলে লংগারভার্সন ও ওয়ানডে ক্রিকেটে দলের সাফল্য ওপেনারদের উপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করে।আর নিউজিল্যান্ডের মত বাউন্সি উইকেটে ওপেনাররা ঠিকঠাক মত নতুন বল সামলাতে না পারলে কিংবা ভালো প্রাথমিক পুঁজি দিতে ব্যর্থ হলে মিডলঅর্ডারের জন্য ব্যাটিং অনেক কঠিন হয়ে যায়। এবং নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে বাংলাদেশের হোয়াইটওয়াশ হওয়ার পেছনে ওপেনারদের কিছু দায় নিতে হবে। লিটন দাস ভালো স্ট্রোকমেকার এবং এই সিরিজে তাঁর কাছে অনেক বেশি প্রত্যাশা ছিল। তবে এই সিরিজে লিটনকে সেভাবে পাওয়া যায়নি। তামিম প্রথম ম্যাচে ব্যর্থ হলেও দ্বিতীয় ম্যাচে অসাধারণ একটি ইনিংস খেলেছেন। এবং ক্যাপ্টেনসির সাথে এরকম একটি ইনিংস ধন্যবাদ পাবার যোগ্য। সবচেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে দ্বিতীয় ওয়ানডেতে বাংলাদেশের ফিল্ডাররা  ক্যাচমিস না করলে ফলাফল হয়তো অন্যরকম হতে পারতো।আর এসব কিছু বিবেচনায় বলতে হয় নিউজিল্যান্ড সফরে ওয়ানডে সিরিজে টাইগারদের ধবলধোলাই হওয়ার পেছনে একটি প্রধান কারণ ছিল ওপেনারদের ছন্নছাড়া পারফরম্যান্স ।

মুশফিকের নিস্ত্রিয়তা

সকলেই জানেন যে বাংলাদেশের ম্যাচজয়ী ক্রিকেটার বা ফিনিশার হিসেবে মুশফিকুর রহিম এক  গুরুত্বপূর্ণ নাম।বহু বড় ম্যাচে দলকে জয়ের বন্দরে নিয়ে যাওয়ার কৃতিত্ব রয়েছে মুশফিকের ঝুঁলিতে।আর নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজে বাংলাদেশের সাফল্যের জন্য মুশফিকের ব্যাটে রানের প্রয়োজন ছিল। যদিও মুশফিক প্রায় প্রতি ম্যাচেই  উইকেটে সেট হয়েও আউট হয়ে গেছেন। এক্ষেত্রে ঠিক কি কারণে এমনটি ঘটল তা অবশ্যই বিশ্লেষণের দাবি রাখে। বাংলাদেশের এযাবতকালের সবচেয়ে সেরা মিডলঅর্ডার ব্যাটসম্যান মুশফিকুর রহিম এবং তাঁর ব্যাটে রানখরা হলে বাংলাদেশের পক্ষে বিদেশের মাঠে ম্যাচজয় বেশ কঠিন বিষয়।এই সফরে ওয়ানডে সিরিজে বাংলাদেশের ব্যর্থতার জন্য মুশফিকের ব্যাটে রানখরাও একটি কারণ ছিল।

মিঠুন,সৌম্যদের ধারাবাহিকতার অভাব

দেশ হোক কিংবা দেশের বাইরে হোক দলের সাফল্যের জন্য উদীয়মান তরুণ ক্রিকেটারদের পারফরম্যান্সে ধারাবাহিকতা খুব গুরুত্বপূর্ণ। মোঃ মিঠুন ,সৌম্য সরকার, লিটন দাস এই সফরে বাংলাদেশের টপঅর্ডারের তিন গুরুত্বপূর্ণ কান্ডারি কিন্তু এই সিরিজে এদের কেউই ধারাবাহিক ছিলেন না। যদিও মিঠুন দ্বিতীয় ওয়ানডেতে ভালো ব্যাটিং করেছেন কিন্তু তৃতীয় ওয়ানডেতে তাকে আর খোঁজে পাওয়া যায়নি।আর নিউজিল্যান্ডের  টাফ কন্ডিশনে ভালো কিছু পেতে হলে তরুণদের ধারাবাহিক ভালো পারফরম্যান্স খুবই দরকারি। মিঠুন,সৌম্য সরকারদের মত তরুণ ব্যাটসম্যানদের কাছে আরো ম্যাচুরড ক্রিকেটের প্রত্যাশা ছিল। আসলে ওয়ানডে ক্রিকেটে পাওয়ার প্লে-প্রথম পনের ওভার-শেষ দশ ওভারের যে ইকুয়েশন রয়েছে সেটি কিন্তু এ সিরিজে বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ে (ব্যতিক্রম দ্বিতীয় ওয়ানডে)অদৃশ্য ছিল।

সাকিবের অভাব দৃশ্যমান ছিল

প্রথম ওয়ানডেতে বাংলাদেশের ব্যাটিং যখন পুরোপুরি ভেঙ্গে পড়ে তখন মিরাজ, সাইফুদ্দিনের মত অলরাউন্ডারের ভূমিকা খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল।কারণ সাকিব দলে নেই এক্ষেত্রে ব্যাটিং বিপর্যয় এড়িয়ে দলকে একটি সম্মানজনক টোটাল দেয়ার জন্য একজন ব্যাটিং অলরাউন্ডারের পারফরম্যান্স প্রয়োজন ছিল। কিন্তু বাংলাদেশ টিমের এক্ষেত্রে একটি শূন্যতা দেখা গেছে।অর্থাৎ সাকিবের অনুপস্থিতিতে বিকল্প একটি স্ট্যাট্রেজি আমাদের হাতে ছিল না। মূলকথা হচ্ছে নিউজিল্যান্ড সফরে বিশেষত ওয়ানডে সিরিজে অলরাউন্ডারদের পারফরম্যান্স মোটেও আশাব্যঞ্জক ছিল না।তাই আমাদের পরামর্শ থাকবে টিটুয়েন্টি সিরিজে এ বিষয়টি যেন ভাবা হয়।

সাইফুদ্দিন-মিরাজদের ভুলভাবে ব্যবহার

ওয়ানডে ক্রিকেটে বাংলাদেশের সাফল্যের পেছনে সুজন ,মাশরাফি, সাকিবের মত অলরাউন্ডারদের অবদান সবসময় গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এবং ওয়ানডে ক্রিকেটে দলীয় সফলতার জন্য অলরাউন্ডারদের ভূমিকা সবসময়ই গুরুত্বপূর্ণ ছিল।এ সিরিজে অধিনায়ক তামিমের হাতে মিরাজ, সাইফুদ্দিনের মত প্রতিষ্ঠিত অলরাউন্ডার ছিল কিন্তু এদের সেরাটা আমরা পাইনি। এখানে অধিনায়ক সম্ভবত অলরাউন্ডারদের সঠিকভাবে ব্যবহার করতে ব্যর্থ হয়েছেন। এক্ষেত্রে আমাদের পরামর্শ থাকবে এ বিষয়টি যেন অধিনায়ক ও টিম ম্যানেজম্যান্ট আরো গভীরভাবে দেখে। নিউজিল্যান্ডের কন্ডিশনে সাইফুদ্দিনের ভালো করার সম্ভাবনা ছিল তবে আমরা সেটি পুরোপুরি পাইনি।

বাজে ফিল্ডিয়ের দায়


ক্রিকেটের পুরনো ও পরিচিত প্রবাদ 'ক্যাচ মিসতো ম্যাচ মিস' । নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজে বাংলাদেশের ক্যাচমিসের মহড়া বেশ অবাক করেছে। এমনকি টাইগার উইকেটরক্ষকের গ্লাভস থেকে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাটসম্যানের ক্যাচমিস হয়েছে। পেশাদারি ক্রিকেটে এভাবে ক্যাচমিসের দায় প্লেয়ার ও সাপোর্ট স্টাফদেরও নিতে হবে।এমনকি একই ম্যাচে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ক্যাচমিস সত্যিই হতাশাজনক। এখানে টিম ম্যানেজম্যান্ট ও প্লেয়ারদের আরো সচেতন হতে হবে।

বোলারদের যত দায়

আসলে যেকোন ক্রিকেটে শেষপর্যন্ত ফলাফল নির্ধারণে ভালো বোলিং খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এবং বাংলাদেশ ওয়ানডে ক্রিকেটে যে সাফল্য ইতিমধ্যে পেয়েছে সেখানে মাশরাফি, সাকিব ,মোস্তাফিজদের ব্যাপক অবদান রয়েছে। সেইসাথে আরো একটি বিষয় অবশ্যই বলতে হয় আর তাহলো মাশরাফি অধিনায়ক থাকাকালিন বাংলাদেশ ওয়ানডে ক্রিকেটে বেশ সাফল্য পেয়েছে। এক্ষেত্রে মাশরাফির বড় একটি গুণ ছিল সঠিক সময়ে সঠিক বোলারকে ব্যবহার করার দক্ষতা। নিউজিল্যান্ড সিরিজে তামিম এক্ষেত্রে হয়তো কিছুটা পিছিয়ে ছিল।তাই নিউজিল্যান্ড সিরিজে বাংলাদেশের হোয়াইটওয়াশ হওয়ার পেছনে বোলারদের সঠিকভাবে ব্যবহারের ব্যর্থতাও কিন্তু উড়িয়ে দেয়া যায় না।

তবু একটি ম্যাচ জিতলে খুশি হতাম

ওয়ানডে ক্রিকেটে বাংলাদেশের অবস্থান বেশ ভালো।তবে নিউজিল্যান্ড সিরিজে বাজে পারফরমেন্স আমাদের সেই সুনামকে কিছুটা হলেও ম্লান করেছে।ধরে নিচ্ছি করোনার দীর্ঘ বিরতির পর কিছু জড়তা হয়তো ছিল তবু বেশকিছু ভুল এবং বারবার একই ভুল অবশ্যই দৃষ্টিকটু।আর যে দলে তিন চারজন বিশ্বমানের প্লেয়ার রয়েছেন তাদের কাছে অবশ্যই একটি ওয়ানডেতে জয়ের প্রত্যাশা ছিল।

নিউজিল্যান্ড-বাংলাদেশ ওয়ানডে সিরিজের ফলাফল


প্রথম ওয়ানডে 

বাংলাদেশ ১৩১(অলআউট)/৪১.৫ ওভারে
নিউজিল্যান্ড ১৩২/২ (২১.২ ওভারে)

দ্বিতীয় ওয়ানডে

বাংলাদেশ ২৭১/৬
নিউজিল্যান্ড ২৭৫/৫

তৃতীয় ওয়ানডে

নিউজিল্যান্ড ৩১৮/৬
বাংলাদেশ ১৫৪(অলআউট) /৪২.৪ ওভার

লিখেছেনঃ প্রভাকর চৌধুরী