WHAT'S NEW?
Loading...

ঢাকা টেষ্টে টাইগারদের পরাজয় অনুসন্ধান

                                                               


চট্টগ্রাম টেস্টের পর ঢাকা টেষ্টে টাইগারদের পরাজয়ের পর বাংলাদেশ ক্রিকেটের অনুরাগী হিসেবে অবশ্যই খারাপ লাগছে। সবচেয়ে খারাপ বিষয় হচ্ছে হোম গ্রাউন্ডে এভাবে টেস্টে টানা হার অবশ্যই হতাশাজনক। এবং এবার ওয়েষ্ঠ ইন্ডিজের দ্বিতীয় সারির দলের কাছে টেষ্টে অসহায় আত্মসমর্পণ মোটেই সুখকর কোন ঘটনা নয়।ঢাকা টেষ্টে টাইগারদের পরাজয়ের কারণ অনুসন্ধান করলে বহু কারণ বেরিয়ে আসবে। টিম সিলেকশন ঠিক ছিল কিনা সে নিয়ে প্রশ্ন আসবে। অভিজ্ঞ ব্যাটসম্যানদের দায়িত্বহীন ব্যাটিংয়ের কথা আসবে। তাছাড়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে  অভিজ্ঞতা ও শক্তি বিবেচনায়  বাংলাদেশের এভাবে টেস্টে পরাজয় বেমানান।ঢাকা টেস্টে বাংলাদেশের পরাজয়ের টুকিটাকি নিয়েই এ লেখাটি তৈরি করা হয়েছে (তথ্যসূএ: উইকিপিডিয়া)।

উইন্ডিজের টসভাগ্য এবং সাকিবের বিকল্প

বাংলাদেশ দলের বড় কান্ডারি সাকিব আল হাসান ঢাকা টেষ্টে ইনজুরির কারণে মাঠে নামতে পারেননি।সঙ্গতকারণে ঢাকা টেস্টে বাংলাদেশের স্কোয়াড কিছুটা হলেও দুর্বল ছিল। এরসাথে ঢাকা টেস্টে সাকিব বিহীন বাংলাদেশের বিপক্ষে টসভাগ্য ওয়েষ্ঠ ইন্ডিজের পক্ষে চলে যায়।টস জেতার ফলে উইন্ডিজ অধিনায়ক ব্যাট করার সিদ্ধান্ত নেন।পুরো ম্যাচের দিকে তাকালে দেখা যায় ওয়েষ্ট ইন্ডিজের প্রথম ইনিংসের ব্যাটিং ঢাকা টেস্টের টানিং পয়েন্ট ছিল। কিন্তু আমাদের পর্যবেক্ষণ বলছে বাংলাদেশের স্কোয়াড এক্ষেত্রে যথেষ্ট ছিল কিনা সেটি ভাবার বিষয়। আবারো এক স্পেশালিষ্ট পেসার নিয়ে টেস্টে স্কোয়াড দেয়া ঠিক ছিল কিনা সেটিও কিন্তু ভাবনার বিষয়। সাকিবের অনুপস্থিতিতে ঢাকা টেষ্টে আসলে আর কোন টাইগার বোলার সেভাবে নিজেকে মেলে ধরতে পারেননি।ওয়েষ্ট ইন্ডিজের প্রথম ইনিংসে বাংলাদেশের বোলাররা উইন্ডিজ দলের রানের গতি থামাতে ব্যর্থ হয়।এর জন্য টাইগারদের স্কোয়াড তৈরিতে ভুল ছিল একথা বলতেই হচ্ছে। কারণ সাকিবের মত বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার দলে নেই সে অবস্থায় স্কোয়াড গঠনে আরো সচেতন হওয়া প্রয়োজন ছিল। তবুও মিরাজ ও তাইজুলের হাতে সুযোগ ছিল কিন্তু এদের কেউই ম্যাচজেতার মত তেমন কিছু করতে পারেননি।বিশেষত উইন্ডিজ দলের প্রথম ইনিংসের ব্যাটিংয়ে রানের লাগাম কোন টাইগার বোলারই সেভাবে ধরতে পারেননি।আর এখানেই ওয়েস্ট ইন্ডিজ দল ঢাকা টেষ্টে এগিয়ে যায়। তামিম ইকবাল সেট হয়েও বড় ইনিংস খেলতে ব্যর্থ হন। মুশফিকের সামনে বড় ইনিংস খেলার সুযোগ ছিল কিন্তু তিনিও ভুল শটে উইকেট দিয়েছেন । মুমিনুলকে ঢাকা টেষ্টে খুঁজে পাওয়া যায় নি। সৌম্য সরকারও চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছেন। সবকিছু মিলিয়ে বলা যায় ঢাকা টেস্টে সাকিবের বিকল্প নিয়ে টিম ম্যানেজমেন্টের ভাবনায় গলদ ছিল।


অভিজ্ঞ ব্যাটসম্যানদের দায় আছে

পরিসংখ্যান ঘাটলে বলা যায় বাংলাদেশের টেষ্টের বর্তমান টপ অর্ডার এই মুহূর্তে বিশ্বের অন্যতম সেরা। তামিম, সাকিব, মুশফিক, মুমিনুল, মাহমুদুল্লাহ, লিটনের সমন্বয়ে গড়া বাংলাদেশের ব্যাটিং লাইনআপ এই মুহূর্তে বিশ্বের যেকোন বোলিং অ্যাটাকের  বিপক্ষে  ফাইট দিতে সক্ষম। এবং গত বিশ্বকাপসহ বিগত দশ পনেরো বছর ধরে এর প্রমাণ পাওয়া গেছে। কিন্তু কথা হলো তবু কেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে টেস্টে বাংলাদেশের এমন ছন্নছাড়া অবস্থা।হয়তো করোনাকালিন কিছু জড়তা ছিল ।কিন্তু সেটি তো উইন্ডিজ দলের জন্যও প্রযোজ্য। এখানে ভুল টিম সিলেকশন বা ফিটনেসের ঘাটতির বিষয়ে সম্ভবত ভাবতে হবে,আরো আলোচনা করতে হবে। সাবেক ব্যাটিং কোচ ম্যাকেঞ্জি তাঁর এক সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশের বর্তমান ব্যাটিং লাইনআপের প্রশংসা করেছেন।এতসব কোয়ালিটি থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশের এই হোম সিরিজের দুই টেস্টে হেরে যাওয়ার কারণে সিনিয়রদের কিছু না কিছু দায় অবশ্যই থাকে।প্রথম টেস্টে বাংলাদেশের ব্যাটিং তাও মোটামুটি আশা জাগানিয়া ছিল কিন্তু দ্বিতীয় টেস্টে ব্যাটিং মোটেও টেষ্টসুলভ ছিল না।ঢাকা টেস্টে তামিম, মুশফিকের আউট খুব দৃষ্টিকটু ছিল।অথচ প্রথম ইনিংসে তামিম, মুশফিক,লিটন, মিরাজের ব্যাটিং অন্যরকম কিছুরই ইঙ্গিত দিয়েছিল।

উইন্ডিজের প্রথম ইনিংস ও টাইগার বোলিং

উইন্ডিজের বিপক্ষে  প্রথম ইনিংসে বাংলাদেশের বোলাররা যে খুব ভালো বোলিং উপহার দিয়েছেন তা কিন্তু বলা যাবেনা।আর উইকেট সম্ভবত সময়ের সাথে ব্যাটিংয়ের জন্য কঠিন হয়ে উঠেছিল কারণ দ্বিতীয় ইনিংসে কোন টিমের ব্যাটিংই ভালো হয়নি।রাহি প্রথম ইনিংসে চার উইকেট পেয়েছেন এ থেকে বলা যায় আরো একজন স্পেশালিষ্ট পেসার স্কোয়াডে রাখলে ম্যাচের রেজাল্ট অন্যরকম হতে পারতো।আর এরফলে ওয়েস্ট ইন্ডিজ তাদের প্রথম ইনিংসে ভালো একটি টোটাল দাড় করাতে সক্ষম হয়।

রাকিম কর্ণওয়াল এবং ওয়েস্ট ইন্ডিজের প্রথম ইনিংস

ঢাকা টেস্টে ওয়েস্ট ইন্ডিজের প্রথম ইনিংসের টোটাল স্কোর তাদের প্রপার গেমপ্ল্যানকে বাস্তবতা দিয়েছে।আর বাকিটুকু করে দিয়েছেন দীর্ঘদেহী স্পিনার রাকিম কর্ণওয়াল।ঢাকা টেস্টে দুই দলের মোট রান হিসেব করলে খুব বেশি পার্থক্য দেখিনা।তবু ওয়েস্ট ইন্ডিজ এই টেস্টে জয়লাভ করে  কর্ণওয়ালের স্পিন ও দারুণ একটি গেমপ্ল্যানের মাধ্যমে।ঢাকা টেষ্টে টাইগারদের নিয়ে উইন্ডিজ টিম প্রচুর গেমপ্ল্যান করে মাঠে নেমেছিল। বাংলাদেশের বোলাররা উইন্ডিজ ব্যাটসম্যানদের দ্বিতীয় ইনিংসে দাঁড়াতে দেয়নি তবু শেষমেশ জয় কিন্তু উইন্ডিজ টিমের পক্ষে গেছে আর এজন্য দ্বিতীয় ইনিংসে বাংলাদেশের দায়িত্বহীন ব্যাটিং দায়ি।

টাইগারশিবিরে অভিজ্ঞ পেসারের অভাব ছিল

মোস্তাফিজুর রহমান বা তাসকিনকে দ্বিতীয় টেস্টে স্কোয়াডে রাখার দরকার ছিল। তাছাড়া মোসাদ্দেক বা মাহমুদুল্লাহর কেউ একজন দলে থাকলে টাইগার বোলারদের আরো সুবিধা হতো। এবং এই প্রসঙ্গে আবারো স্কোয়াড সিলেকশন নিয়ে কথা এসে যায়। আমরা জানি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে কোন দলকে খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। তাছাড়া মিরপুর হচ্ছে দেশের হোম অব ক্রিকেট । মিরপুরের উইকেটের চরিত্র টাইগার টিম ম্যানেজম্যান্ট সবচেয়ে ভালো জানে।অথচ টিম ম্যানেজম্যান্ট একজন  স্পেশালিষ্ট পেসার দিয়ে স্কোয়াড দিয়েছে। তাসকিন,মোস্তাফিজের যেকোন একজনকে স্কোয়াডে রাখার সুযোগ ছিল। 

বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ে দুর্বলতা

চট্টগ্রাম টেস্টে যদিও অধিনায়ক মুমিনুল এবং মিরাজ সেঞ্চুরি করেছিলেন কিন্তু ঢাকা টেস্টে মুমিনুলকে সেভাবে আর পাওয়া যায় নি।আসলে ঢাকা টেস্টে বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ে একটি ছন্নছাড়া ভাব দেখা গেল। তামিম দ্বিতীয় ইনিংসে চমৎকার ব্যাটিং করছিলেন তবু হঠাৎ বাজে শট খেলে আউট হয়ে গেলেন।মুশফিকও দ্বিতীয় ইনিংসে সেট হয়ে উইকেট দিয়ে আসলেন।আর মিরপুরের পরিচিত উইকেটে এভাবে অভিজ্ঞ টাইগার ব্যাটসম্যানদের সেট হয়েও আউট হওয়ার দৃশ্য মোটেও সুখকর ছিল না।শান্তকে এভাবে টেস্টে বারবার সুযোগ দেয়ার পক্ষে যুক্তি ছিলনা।সৌম্যও নিজেকে মেলে ধরতে পারেননি।আসলে এই হোম সিরিজে বাংলাদেশের টেস্টের ব্যাটিং নিয়ে কেমন প্ল্যান ছিল তা স্পষ্ট নয়।

তবু হোম সিরিজে এভাবে ধারাবাহিক টেস্টহার অবশ্যই ভাবনার

সেই আফগানিস্তানের বিপক্ষে হোমটেষ্টে হারের পর থেকে যদি হিসেব করা হয় তবে দেখা যায় দেশের মাটিতে গত দুই বছর ধরে বাংলাদেশের টেস্টের পারফরম্যান্স আশাব্যঞ্জক নয়। হাবিবুল বাশার, আশরাফুল, শাহরিয়ার নাফিসদের সময় বাংলাদেশ টেষ্টে নতুন যুগে প্রবেশ করে। এবং বাশার,আশরাফুলদের সময় বাংলাদেশ টেষ্টে" টু অর ত্রিম্যান" তত্ত্ব নিয়ে ব্যাটিংয় করেছে। বর্তমান টিমে চার থেকে পাঁচজন স্পেশালিষ্ট ও পরীক্ষিত ব্যাটসম্যান রয়েছেন তবু বাংলাদেশ হোম সিরিজে টেস্টে তুলনামূলক দুর্বল টিমের কাছে হেরে যাচ্ছে এটি অবশ্যই ভাবনার বিষয়। মুশফিক, মুমিনুল, সাকিবের টেস্টে ডাবল সেঞ্চুরিও আছে। তাছাড়া দলে একাধিক ফিট ও স্পেশালিষ্ট ফাষ্টবোলার রয়েছেন তবু একজন নিয়ে টেস্ট স্কোয়াড দেয়ার কারণও খুঁজতে হবে। তাছাড়া সাকিবের অনুপস্থিতিতে এভাবে একজন স্পেশালিষ্ট ফাষ্টবোলার নিয়ে স্কোয়াড দেয়া কতটুকু যুক্তিসঙ্গত ছিল তাও ভাবতে হবে।আসলে কিছুটা গভীরে গেলে দেখা যায় বাংলাদেশ ইদানিং হোম সিরিজে টেস্টে ভালো করতে পারছে না। দেশের মাটিতে টেস্টে বাংলাদেশের প্লেয়াররা সেরাটা দিতে পারছে না। এবং এ নিয়ে টিম ম্যানেজমেন্টকে আরো কাজ করতে হবে। টেস্ট ক্রিকেট হচ্ছে বেসিক ক্রিকেট। এখানে ভালো করেই শ্রীলঙ্কার মত একসময়ের দুর্বল ক্রিকেট শক্তি বিশ্বকাপ শিরোপাও জয় করেছে।এ অবস্থা কাটানোর জন্য তাই আমাদের দাবি হচ্ছে লংগারভার্সনের প্রতি দেশের ক্রিকেট টিম ম্যানেজমেন্ট এবং প্লেয়ারদের আরো মনোযোগী হতে হবে।

বাংলাদেশের টেস্ট পরিসংখ্যান

বাংলাদেশ ইতিপূর্বে ১২১টি টেস্ট খেলেছেন। বাংলাদেশ ১৪টি টেস্টে জয়লাভ করেছে ও ৯১টি টেস্টে পরাজিত হয়েছে এছাড়া বাংলাদেশ ১৬টি টেস্টে ড্রয়ের দেখা পেয়েছে। বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি টেস্ট জিতেছে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে (৭ জয়) এবং বাংলাদেশ টেষ্ট ক্রিকেটে সবচেয়ে বেশি হেরেছে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে (১৬ পরাজয়)।

টেস্টে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ ইনিংস টোটাল


৬৩৮ রান - প্রতিপক্ষ শ্রীলঙ্কা।
৫৯৫/৮ ডিক্লেয়ার - প্রতিপক্ষ নিউজিল্যান্ড।
৫৫৬রান -প্রতিপক্ষ ওয়েস্ট ইন্ডিজ।
৫৫৫/৭ডিক্লেয়ার - প্রতিপক্ষ পাকিস্তান।
৫২২/৮ডিক্লেয়ার- প্রতিপক্ষ জিম্বাবুয়ে।

বাংলাদেশের সর্বনিম্ন টেস্টটোটাল

রান        - প্রতিপক্ষ
৪৩রান    -   ওয়েস্ট ইন্ডিজ।
৬২রান    -  শ্রীলঙ্কা।
৮৬রান    - শ্রীলঙ্কা।
৮৭রান    - ওয়েস্ট ইন্ডিজ।
৮৯রান    - শ্রীলঙ্কা।

বাংলাদেশের সর্বোচ্চ ব্যবধানে টেস্ট জয়

১. ইনিংস ও ১৮৪ রানে জয়  - প্রতিপক্ষ ওয়েস্ট ইন্ডিজ।
২. ইনিংস ও ১০৬ রানে জয়  -  প্রতিপক্ষ জিম্বাবুয়ে।

টেস্টে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ ব্যবধানে পরাজয়

১. ৪৬৫রানে পরাজয় - প্রতিপক্ষ শ্রীলঙ্কা।
২. ৩৩৫ রানে পরাজয় - প্রতিপক্ষ জিম্বাবুয়ে।
৩. ৩৩৩ রানে পরাজয় - প্রতিপক্ষ দক্ষিণ আফ্রিকা।

টেস্টক্রিকেটে বাংলাদেশের সর্বাধিক রানচেজ ও জয়

৬ উইকেটে ২১৭ রান - প্রতিপক্ষ ওয়েস্ট ইন্ডিজ।

লিখেছেন: প্রভাকর চৌধুরী